আপনাদের যদি প্রশ্ন করা হয় যে পৃথীবিতে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণী কোনটি? আপনারা হয়ত হলিউড এর সিনেমার দৈত্যের মত কোন প্রাণীর উদাহরন টেনে আনবেন। কিন্তু যদি বলি আপনার উত্তর সম্পূর্ন ভুল কারণ মানুষ মারার নিরিখে পৃথিবীতে সবচেয়ে উপরে যেই প্রাণীটি রয়েছে সেটা আর কেউ না বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় পশু বাঘ। পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ কেবল বাঘের আক্রমনেই মারা যায়। আর এ ব্যাপারে ভারত পৃথিবীতে সকল দেশের শীর্ষে কারণ এই ৪০০ জনের মধ্যে প্রায় ৮৫ জনই ভারতের।
আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন যে, বাঘ যদি মানুষের বিলুপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়? যদি কোন বাঘ এতটাই হিংস্র হয়ে উঠে যে তার ভয়ে কোন গ্রাম বা জনপদ রাতারাতি খালি করতে হয়, আপনি হয়ত ভাবছেন আমি পাগলের মত কি বলছি, এমনটা হওয়া আবার সম্ভব নাকি। তাহলে এখানে আপনাকে বলে রাখা ভাল এরকম ঘটনা ভারত ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই ঘটেছে।
উপরে আপনি যে ছবিটি দেখছেন এটি দুর্ধর্ষ শিকারি জিম করবেট এর এবং সামনে যে বাঘিনীর মৃতদেহের ছবিটি দেখছেন তার ক্ষুদা নিবারণ করেছে ৪৩৬ টি মানুষ। জিম করবেট ঠিক কিভাবে এই বাঘিনীটিকে শিকার করেছে তা আজ আমরা জানবো।
সাল টা ছিল ১৯০৩, নেপালের জঙ্গলে এক বাঘিনী হঠাৎ হিংস্র হয়ে উঠে। এই বাঘিনী প্রথমে জংগলে কাঠ কাটতে যাওয়া মানুষদের শিকার করতো, যখন জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে কয়েকজন মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন ঐ এলাকার মানুষ দলবেধে জঙ্গলে যেতে শুরু করলো। প্রথম কয়েকদিন ঠিকঠাক কাটলেও পরে দেখা গেল এই বাঘিনীর হিংস্রতা বিন্দুমাত্রও কমেনি, বরং সে এখন আরো চালাকির সাথে শিকার করা শুরু করেছে। যখন মানুষ দলবেধে জঙ্গলে যাওয়া শুরু করে বাঘিনীটি চুপিসারে তাদেরকে অনুসরণ করতে লাগলো এবং যখনই কোথাও কাউকে দলছুট হতে দেখতো ঠিক তখনই বাঘিনী তাকে আক্রমন করে চুপিসারে জঙ্গলে টেনে নিয়ে যেত। এই একই ঘটনা বেশ কয়েকবার ঘটায় গ্রামবাসি বাঘিনীর এই চাল ধরতে পারে এবং এর পর থেকে তারা ঐ জঙ্গলে যাওয়াই ছেড়ে দিল। কিন্তু এখন বাঘিনীর হিংস্রতা আরো বেড়ে গেল। এখন মাঝে মাঝে সে গ্রামে ঢুকে মানুষ মারতে শুরু করলো। এই ভাবে যখন মৃত্যুসংখ্যা ২০০ তে পৌছালো তখন নেপাল সরকার এই বাঘিনীকে মারার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিল। নেপালের সেনারা ঐ বাঘিনীকে মারার জন্য জঙ্গলে তল্লাশি শুরু করলো ঠিকই কিন্তু তারা কোন ভাবেই সফল হতে পারছিল না। তারা ঐ বাঘিনীকে ধরার জন্য যখনই কোন ফন্দি করতো তা কোন না কোন ভাবে ব্যার্থ হতো। বার বার বিফল হওয়ার পর সেনাদের মনোবল ও ভাঙতে শুরু করলো। নেপাল সরকারের এই অভিযানে বাঘিনীকে ধরা তো সম্ভব হলই না উল্টো এই অভিযান চলাকালে এই বাঘিনীর আক্রমণে বেস কিছু সেনা নিহত হয়েছেন। পরিস্থিতি যখন আরো গম্ভীর হতে শুরু করলো তখন নেপাল সরকার আরো নামীদামী শিকারি ও সেনাদের নিয়ে একটি বিশেষ দল গঠন করলো। এই দলের কাজ ছিল তারা এই জঙ্গলে চিরুনি অভিযান করে ঐ বাঘিনীকে খুঁজে বের করবে। এই দল তাদের কাজ শুরু করলো কিন্তু তারা বাঘিনীকে ধরতে পারলো না, তবে তাদের এই তল্লাশির ফলে নেপালের সীমানা ছেড়ে ভারতের জঙ্গলে ঢুকে পরলো। যখন নেপাল সরকার ঐ বাঘিনীর গতিবিধি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো তখন তারা খুশি হয় কারণ এটা তখন তাদের সমস্যা ছিলনা তাই তারা তাদের সেনা অভিযান সেখানেই শেষ করে।
ভারতের জঙ্গলে ঢোকার পর বাঘিনী সেখানেও একের পর এক হত্যাকান্ড চালাতে থাকে। এইবার তার হিংস্রতা এতটাই বেড়ে গেল যে, এখন সে দিনে দুপুরেই গ্রামে ঢুকতে শুরু করলো এবং নিজের হত্যালীলা চালিয়ে যায়। তখন ভারত সরকার এই বিষয়টি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলো এবং দেশের সমস্ত নামীদামী শিকারিদের আহ্বান জানালো। ভারত সরকার এই বাঘিনীকে হত্যা করার জন্য বহুল অর্থ পুরস্কার ধার্য করলো। কিন্তু এই বাঘিনীকে হত্যা করতে তারাও সম্পূর্ন রুপে ব্যার্থ হলো। একদিকে ভারত সরকারের কাছে আসছিল বারংবার ব্যার্থতা অন্যদিকে এই বাঘিনীর ত্রাস দিনদিন বেরেই যাচ্ছিল। পরিস্থিতি এক সময় এমন হতে শুরু করেছিল যে, গ্রামবাসীরা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে গ্রাম ছেঁড়েই চলে যেতে শুরু করলো। এমন অবস্থায় ভারত সরকার স্বয়ং দেবদ্যুত এর মত এমন একজন কে পেয়ে গেলেন যিনি এখনো পর্যন্ত কোন শিকারে ব্যার্থ হয়নি, আর এই মানুষটি ছিলেন স্বয়ং কর্নেল জিম করবেট। জিম করবেট ভারত সরকারের হয়ে এই বাঘিনীকে হত্যার প্রস্তাব গ্রহন করেছিলেন ঠিকই কিন্তু তার সাথে দুইটি শর্ত দিয়েছিলেন। তার প্রথম শর্ত ছিল এই বাঘিনীকে হত্যার জন্য সরকার যেই অর্থ পুরষ্কার ঘোষণা করেছে তা বাতিল করতে হবে এবং ঐ বাঘিনীকে মারার জন্য যে সকল সেনা নিযুক্ত করা হয়েছে তাদের ফেরত আনতে হবে। ভারত সরকার তার এই দুটি শর্তে খুব অবাক হয়েছিলেন কিন্তু তিনি তার এই দুটি শর্তের উপযুক্ত কারণ ও দেখিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, এই পুরষ্কার মূল্যের লোভে কোন নিরীহ মানুষ এই বাঘিনীকে মারার চেষ্টা করবে এতে তারও জীবন যেতে পারে আর দ্বিতীয়ত এত সেনা ও শিকারির মাঝে ঐ জঙ্গলের অন্যান্য বাঘের ও জীবন চলে যেতে পারে। ভারত সরকার করবেটের এই দুটি শর্ত মেনে নেয় এবং এই বাঘিনীকে মারার জন্য জিম করবেট নিজের অভিযান শুরু করেন। আপনি হয়ত ভাবছেন তিনি এই নরখাদক কে হত্যার জন্য প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নিজের যাত্রা শুরু করেছেন, কিন্তু আপনি শুনে অবাক হবেন যে, এই অভিযানে করবেটের হাতিয়ার ছিল শুধু তার বিশ্বাসযোগ্য একটি রাইফেল। করবেট এই নরখাদককে হত্যার দ্বায়ীত্ব নিয়ে জঙ্গলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। এই ঘটনাটি ভারতের চম্পাবত নামের একটি জঙ্গলে হয়েছিল এবং জঙ্গলে আসার আগে করবেট ঠিক করলেন তিনি জঙ্গল অধ্যুষিত এলাকায় কিছুদিন কাটাবেন এবং বাঘিনীর আক্রমণের ধরন ও সময় সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জানবেন। কিন্তু তিনি তখনো জানতেন না যে, এই হিংস্র নরখাদক বাঘিনীর মুখোমুখি খুব শীঘ্রই হতে হবে। তিনি তার তথ্য সংগ্রহের জন্য গ্রামবাসীদের সাথেই থাকতে শুরু করেছিলেন এবং বাঘিনীর শিকার সম্পর্কে তথ্য জেনেছিলেন, এবং ঠিক দুই দিনের মাথায় ঐ বাঘিনীকে শিকার করার উপযুক্ত সময় পেয়ে গিয়েছিলেন । দুই দিনের মাথায় ঐ বাঘিনী গ্রামের এক ১৬ বছরের কিশোরীকে আক্রমন করে ও তাকে টেনে জঙ্গলের ভিতরে নিয়ে যায়, বাঘিনীটি তখনো জানতো না যে এটিই হতে যাচ্ছে তার জীবনের সবচেয়ে বর ভুল ও শেষ শিকার। বাঘিনীটি যখন ঐ কিশোরীকে জঙ্গলের ভিতর টেনে নিয়ে যাচ্ছিল তখন জঙ্গলের মাটিতে কিশোরীর রক্তের দাগ পরছিল এবং করবেট ঐ রক্তের দাগ দেখেই বাঘিনীকে অনুসরণ করতে লাগলো। বেশ কিছুদূর চলার পর তিনি বাঘের ডেরা আবিস্কার করে ফেললেন। তবে সেদিন সন্ধ্যা নেমে আসায় ফিরে আসতে বাধ্য হলেন এবং বুঝলেন এইভাবে অথই সমুদ্রে নুড়ি পাথর খোঁজা সম্ভব নয় এখন এই নরখাদককে মারার একমাত্র উপায় হল জঙ্গলে ঘিরে বির দেওয়া। এখানে হয়তো অনেকেই জানেন না বির দেওয়া কি? বির দেওয়া হল জঙ্গলের চারিদিকের সীমান্তে দাড়িয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে যথাসম্ভব শব্দ করা যাতে জঙ্গল থেকে বাঘ পালাতে না পারে। তাই তিনি ঠিক করলেন এই মূহুর্তে গ্রামে গিয়ে মানুষজনকে বলে জঙ্গলে বির দেওয়ার ব্যাবস্থা করবেন। তিনি যখন গ্রামের প্রধান কে বির দেওয়ার কথা বললেন, তখন তিনি প্রথমে রাজি হলেন না, যখন জিম করবেট বললেন যদি বির দেওয়ার ব্যাবস্থা না হয় তবে হয় নরখাদকের জীবন আমার হাতে যাবে নয়ত নরখাদকের কাছে আমার জীবন যাবে। এই কথা শুনে গ্রামের প্রধান কিছুটা ঘাবড়ে যায় এবং তিনি করবেট কে আশ্বাস দেন যে তিনি বির দেওয়ার জন্য লোকজন যোগার করছে। পরদিন সকালে করবেটের বাংলোর সামনে এক এক করে লোক জড়ো হতে শুরু করলো। দুপুর ২টা নাগাদ ২৯৮ জন লোক সহ করবেট এবং গ্রামের প্রধান জঙ্গলের দিকে যাত্রা শুরু করলেন। তবে সেদিন গ্রামবাসীদের হাতে ছিল বিভিন্ন বেআইনি মারণাস্ত্র যা দিয়ে অনায়াসে একটি কেন ১০-২০ টি নরখাদক মেরে ফেলা সম্ভব। তিনি জঙ্গলে গিয়ে মানুষজনকে ছোট ছোট দলে ভাগ করে দেন এবং প্রত্যেকটি দল জঙ্গলের চারিদিকে অবস্থান নিলে করবেট এবং গ্রামের প্রধান জঙ্গলে ঢুকে গেলেন। জঙ্গলের মাঝামাঝি পৌছাতেই দক্ষিণ প্রান্ত থেকে হইচই ও বন্ধুকের আওয়াজ শোনা গেল। সাথে সাথেই করবেট বুঝতে পারলেন যে তারা চরম বিপদে পরে গেছে কারণ তাদের প্লান ছিল তারা উত্তর প্রান্তে পৌছালে তারপরই তারা হইচই শুরু করবে। এখন আওয়াজ শুনে যেকোন মূহুর্তে বাঘিনী তাদের সামনে এসে পরবে। আর যেমন চিন্তা তেমনই কাজ। ঠিক তাই হল, জঙ্গলের মধ্যে থাকা দুটি গিরিখাদ এর মাঝামাঝি একটি ঘাসের ঢাল ধরে বাঘিনীকে বড় বড় লাফে নামতে দেখলেন, সাথে সাথে গ্রামের প্রধান বাঘিনীকে তাক করে দুটি গুলি ছুঁড়লেন। কিন্তু করবেট যেই ভয়টি করছিলেন ঠিক তাই গ্রামের প্রধান করে বসলেন। একটি গুলিও বাঘিনীর গায়ে লাগলো না। বরং বাঘিনী তার গতিপথ পাল্টে উত্তরমুখী হয়ে ছুটতে শুরু করলো। তড়িঘড়ি করে করবেট ও একটি গুলি ছুঁড়তে বাধ্য হলেন। বাঘিনী আবার তার গতিপথ পরিবর্তন করে করবেটের দিকে ছুটে আসতে শুরু করলো, করবেট বুঝতে পারলেন এটাই শেষ সুযোগ। নিজের হাতে থাকা ৫০০ মডিফাইড করবেট রাইফেলটি সি লেভেল সাইজ ফিক্সড করে গুলি ছুঁড়লেন। তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন গুলিটি সোজা গিয়ে বাঘিনীর পিঠে লাগলো। বাঘিনী একটু শিঙরে উঠলো ঠিকই কিন্তু নিজের গতি একটুও থামালো না। করবেট আবারো একটি গুলি ছুঁড়লেন, দ্বিতীয় গুলি খাওয়ার পরেও বাঘিনী দাঁত খিঁচিয়ে করবেটের নিকট তেঁরে আসতে লাগলো। তৃতীয় গুলি ছোড়ার জন্য করবেট ট্রিগার চাপলেন কিন্তু সর্বনাশ কোন গুলি বের হলোনা, আসলে বাংলো থেকে তিনি ৩ টি গুলি নিয়েই বের হয়েছিলেন কারণ তিনি একবারো ভাবেননি যে, তিনের অধিক সুযোগ পাওয়া যাবে একটি বাঘিনীকে মারার জন্য। বাঘিনীটি একেবারেই করবেটের কাছাকাছি চলে এসেছে অবশ্যম্ভাবী মৃত্য করবেট তার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলেন। বাঘিনী হুংকার দিতে দিতে করবেটের দিকে ছুটে আসছে, ঠিক সেই মূহুর্তে গ্রামের প্রধান তার হাতে থাকা রাইফেলটি করবেটের দিকে ছুঁড়ে দিলেন এবং বললেন একটিই গুলি আছে এটাই বাঁচার শেষ সুযোগ, রাইফেলটি হাতে তুলতেই বাঘিনীটি করবেটকে লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিল, একেবারে পয়েন্ট ব্লাঙ্ক রেঞ্জ করে করবেট শেষ গুলি ছুঁড়ে দিলেন, সৌভাগ্যবসত গুলিটি লক্ষ্যভেদ করলো। বাঘিনীর প্রাণশক্তি এতদূরই ছিল, তৃতীয় গুলিটি খেয়ে বাঘিনীটি করবেটের সামনে লুটিয়ে পরলো। জিম করবেট এভাবেই শিকার করেছিল ৪৩৬ জন মানুষকে শিকার করা নরখাদক বাঘিনীকে।

আপনাদের মনে একটি প্রশ্ন জাগতে পারে যে, বনের বাঘ কেন তার স্বাভাবিক শিকার ছেড়ে হঠাৎ নরখাদক হয়ে উঠলো?

জিম করবেট বাঘিনীটিকে শিকার এর পর তার চামড়া ছাড়াচ্ছিলেন তখন তিনি খেয়াল করলেন বাঘিনীটির নিচের চোয়ালের ছেদন দাঁত একটি ভাঙ্গা, যা থেকে বুঝা যায় যে সে এই কারণে তার স্বাভাবিক শিকার ক্ষমতা হারিয়েছে এবং সবচেয়ে সহজ শিকার মানুষকে বেছে নিয়েছে বেঁচে থাকার জন্য।
সূত্রঃ কুমায়ুনের মানুষখেকো (Man-Eaters of Kumaon, 1944) লেখকঃ জিম করবেট

