বেঙ্গল টাইগারের দেশ সুন্দরবনের ভ্রমণ পরিচিতি (পর্ব-১)
ভ্রমণ স্থানঃ হাড়বাড়িয়া, কটকা, জামতলা
প্রকৃতি তার নিজস্ব ভাষায় কথা বলে তখনই কথা বলে যখন মনুষ্য সৃষ্ট শ্বব্দ থেকে মুক্ত থাকে। প্রকৃতির প্রতিটা অংশরই আলাদা নিজস্ব সঙ্গীত আছে, গাছের একরকম আবার নদীর জলের অন্য। সমুদ্রের সঙ্গীত গুরুগম্ভীর প্রাণী কূলের ভিন্ন।
এই অনন্য ভিন্ন ভিন্ন সঙ্গীত উপভোগ করার উপযুক্ত স্থানের একটি “সুন্দরবন”।
একজন ভ্রমণকারীর ভ্রমণটি উপভোগ্য হয় ভ্রমণ স্থানটি সম্বন্ধে সঠিক ধারণা এবং প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির মিলের উপর।
এসব বিবেচনায় এবার আমার প্রচেষ্টা সুন্দরবনে ভ্রনণ স্থান গুলোর সঠিক পরিচিতি তুলে ধরার যা একাধিক পর্ব আকারে প্রকাশ করা হবে। এবারে প্রথম পর্ব প্রকাশ করা হলো…..
বিখ্যাত বেঙ্গল টাইগারের আবাস ভূমি সুন্দরবন যা পৃথিবীর সর্ব বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন। ঝড় জলচ্ছাস মোকাবিলায় প্রাকৃতিক দেওয়াল হিসেবে বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেষে গড়ে উঠা সুন্দরবনের বৃহৎ এবং মূল অংশ বাংলাদেশে অবস্থিত। সুন্দরবন বাংলাদেশের খুলনা, বাগেরহাট সাতক্ষীরা এবং কিছু অংশ বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলা জুড়ে বিস্তৃত যার অয়তন ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার ।
সুন্দরবনের উদ্ভিদ, জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং নিরাপদ ভ্রমণ উপযোগী হওয়ার কারণে দেশী বিদেশী পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় ভ্রমণ স্থান হিসেবে বেশ পরিচিত। পর্যটকেরা একমাত্র সুন্দরবনেই নৌ ভ্রমণ, প্রকৃতি, বন্য জীবন এবং সমুদ্র এক সাথে উপভোগ করতে পারেন।
সুন্দরবনে সুন্দরী,গেওয়া,গড়ান, কেওড়া,পশুর,বাইন, গোলপাতা, কাকড়া সহ প্রায় ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে যা প্রকৃতি প্রেমীদের আকর্ষনের বিষয়।
রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, বন্য শুকর, বানর, শজারু,উদবিড়াল সহ প্রায় ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী । নোনা জলের কুমির, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, ভোঁদড়, কচ্ছপ, ডলফিন, কাঁকড়া, অসংখ্য রকমের মাছ সহ ৩৫ প্রকার সরীসৃপ, ৮ প্রকার উভয়চর এবং আবাসিক ও পরিযায়ী মিলে প্রায় ২৭০ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এ সব প্রাণীকুলের অনেক গুলোই ভ্রমণে যেয়ে প্রাই দেখা মেলে যা পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
হাড়বাড়িয়া ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রঃ
হাড়বাড়িয়া মিঠা পানির পুকুরখুলনা বা মোংলা থেকে আরামদায়ক নৌ ভ্রমণের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে রূপসা এবং পশুর নদী ধরে বাগেরহাট জেলার সুন্দরবন অংশে প্রবেশ করে সাধারণত প্রথম দিন দেখা হয় হাড়বাড়িয়া ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র যা মোংলা থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দক্ষিণে পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের পশুর নদীর তীরে অবস্থিত।
হাড়বাড়িয়ায় গাছের ঘনত্ব খুব বেশী এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল হওয়ায় গভীর বনের ভিতর দিয়ে বন বিভাগ নির্মিত কাঠের ফুট ট্রেইল ধরে ভ্রমণ করা হয় । নিরাপত্তার জন্য সশস্ত্র বন রক্ষী এবং প্রশিক্ষিত গাইডের নির্দেশনায় সারিবদ্ধ ভাবে চলতে হবে নির্দিষ্ট ফুট ট্রেইল ধরে।
নদীর মাঝে নোঙ্গর করা শীপ থেকে সঙ্গে আনা দেশী নৌকায় যখন পল্টনে নামবেন তখন হয়তো আপনাকে অভ্যর্থনা জানাবে একদল বন্য বানর। ছোট ঝুলন্ত সাকো এবং মিষ্টি জলের শাপলা পুকুর পাশে রেখে প্রবেশ করবেন গভীর বনে।
মিষ্টি জলের জোগান দিতে ১৯৯৭-৯৮ সালে বীর শ্রেষ্ঠ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্মরণে খনন করা হয় এই পুকুর যার জঙ্গল প্রান্তে বাঘ হরিণের জল খাওয়ার পছন্দের স্থান। ঘন সবুজ বনের মাঝে মুগ্ধতা ছড়ানো লাল শাপলা ফোটা পুকুরকে বায়ে রেখে কিছুটা ইটের রাস্তা ধরে এগোলেই ঘন বন এবং তার একটু সামনেই ওয়াচ টাওয়ারের পাশ দিয়ে কাঠের ফুট ট্রেইল। কিছুক্ষন ওয়াচ-টাওয়ারের উপর থেকে সৌন্দর্য উপভোগ করে দু,পাশে ঘন শ্বাসমূল যুক্ত ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ আর তার মাঝে নিরাপত্তা বেষ্টনী দেওয়া সরু কাঠের ফুট ট্রেইল ধরে হাটার সময় দেখতে পাবেন সুন্দরী, গোলপাতা, গেওয়া ইত্যাদি উদ্ভিদের আধিক্য । মাটিতে দেখবেন প্রচুর হরিণের পায়ের ছাপ এবং নিশ্চুপ থাকলে হরিণের দেখাও মিলে যেতে পারে। এই বনে বিরল প্রজাতির মায়া হরিণের দেখাও মেলে আবার অনেক সময় বাঘের পায়ের ছাপ বা হরিণ শিকারের চিহ্ন স্পষ্ট দেখা যায় ট্রেইলের পাশে নরম কাঁদায়।
ধীর পায়ে হাটছেন দু পাশে ঘন জঙ্গল নিচে লক্ষ করলে দেখবেন কাঁকড়ার পাল ছুটে লুকাচ্ছে আপনার চলার শব্দে। অনেক সময় হটাৎ রাজ গোখরা বা শঙ্খচুড়া শাপের দেখা মেলে।
এই বনে আলো আধারের যে খেলা চলে তাতে চমৎকার ছবি তোলার উপযুক্ত তাই ধীরে চলে সেই সুযোগ নিতে হবে। এরই মধ্যে চলার ট্রেইলটি প্রায় দেড় কিলো মিটার ইউ আকারে ঘুরে পুকুরের অন্য পাশ দিয়ে বের হয়েছে আর তখন যদি আপনি একটু ক্লান্ত হোন তবে বিশ্রাম নিতে পারেন পুকুরের মাঝে কাঠের নির্মিত বসার বিশ্রামাগারে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিশুদ্ধ প্রকৃতি উপভোগ করে ফিরতে পারেন আপনার ভাসমান বাড়ীতে পরের গন্তব্যে যাওয়ার জন্য৷
কটকা অভয়ারণ্যেঃ 
কটকাতে হরিণের বিচরন
পশুর নদী থেকে সেলা নদী ধরে সর্পিল পথে প্রায় ৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণে শরণখোলা রেঞ্জে কটকা অভয়ারণ্য। জীববৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য স্থানটি পর্যটকদের মূল আকর্ষণীয় স্থান। কটকা অভয়ারণ্যে বঙ্গোপসাগরে মোহনায় অবস্থিত সুন্দরবনের সুন্দর এবং রোমাঞ্চকর স্থানের মধ্যে অন্যতম যেখানে দেখা যাবে প্রাকৃতিক মনোরম সৌন্দর্যের সাথে বন্যপ্রাণী। এখানে বন বিভাগের একটি স্থায়ী ক্যাম্প রয়েছে যেখান থেকে কিছু দক্ষ বনরক্ষক এই অঞ্চলের এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা দেয়। কটকা পৌছে প্রাই শীপ থেকে দেখা মেলে হরিণ, শুকর বা বানরের আবার কখনো ভাটির সময় পাড়ে উঠে কুমিরের রোদ পোহাতে দেখা অস্বাভাবিক কিছু নয়। প্রথম থেকেই রোমাঞ্চ নিয়ে জঙ্গল সাফারির উদ্দেশ্যে সঙ্গে নেওয়া দেশী নৌকায় চড়ে পর্যটকদের জন্য নির্মিত কাঠের জেটি পেরিয়েই ছায়া ঘেরা বন রক্ষীদের ক্যাম্প। গাইড এবং বন রক্ষীদের নির্দেশনায় সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে হবে কাঠের ফুট ট্রেইল ধরে সেই সাথে নিশ্চুপ এবং সচেতন থাকা এখানে বাধ্যতামূলক কারণ আপনি সরাসরি বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থলে। ফুট ট্রেইল থেকে বনে নামলেই অসংখ্য কেওড়া গাছ যার তলে হরিণ শুকরের বিচরণ চোখে পড়বে। এখানকার হরিণ গুলো বেশ সাহসী তাই অনেকটা কাছ থেকে দেখামেলে । স্থানটিতে সিডর এবং আয়লার ধংশের চিহ্ন এখনো বিদ্যমান কারণ সিডরের মূল অংশের আঘাত এই অঞ্চলে এনেছিলো। কেওড়া গাছ পার হলে শ্বাস মূল এবং ঘন গড়ান বনের মধ্য দিয়ে এগোলে টাইগার টিলার দেখা মিলবে এবং গড়ান বনের গভীরে আরো দুইটা টিলা পাওয়া যাবে। টাইগার টিলা আসলে প্রায় সাড়ে তিন শত বছর পূর্বে লবন চাষের জন্য পরিত্যক্ত মাটির তৈরী সরঞ্জাম স্তূপ আকারে রেখে যাওয়ার নিদর্শন যা টিলার আকারের মতো একটু উঁচু হওয়ায় জোয়ারের জল উঁঠে না। জল না উঁঠায় বেঙ্গল টাইগার প্রাই এখানে অবস্থান নেয় বলে টাইগার টিলা নামকরণ করা। টিলা গুলোতে বাঘের পায়ের ছাপ এবং নখের আচড় প্রায়ই চোখে পড়ে আবার কখনো পাবেন শিকারের হাড় বা পশমের অস্তিত্ব। প্রথম টিলা থেকে গাঁ ছমছমে পথ পেরিয়ে দ্বিতীয় তারপর তৃতীয় টিলা এবং তৃতীয় টিলা থেকে কিছুটা সামনে এগোলে বয়ার খাল ৷ খালের পাড়ে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম সাথে একটু ফোটোসেশান করে ভয় কাটালে মন্দ হয় না৷ তারপর ফিরতি পথে কেওড়া গাছের তলা দিয়ে হরিণের পালকে বিদায় জানিয়ে কটকা বীচে আসতে হবে। মনোরম সুন্দর কটকা বীচে সূর্যাস্তের সময় অসাধারণ সুখ অনুভূতি দিবে। সেখানে কিছু সময় পার করে প্রফুল্লতা এবং ক্লান্তি নিয়ে শীপে ফিরে এরপরের যাত্রা স্থান জামতলা হয়ে বাদামতলী সী-বীচে।
জামতলাঃ
চলবে………..
ছবি সৌজন্যেঃ হাফশাট ফটোগ্রাফি

