সুন্দরবন ভ্রমণ সব সময়ই এডভেঞ্চারে ভরপুর। অনেক দিনের ইচ্ছে ছিলো ভিন্নমাত্রার এডভেঞ্চার ট্যুর করার। পরিকল্পনা করি প্রায় দুই মাস আগে ভরা পূর্নিমা দেখে। যাত্রা শুরু রাত ১০ টায় মংলা থেকে কার্তিক মাসের পূর্ণ যৌবনের চাঁদ মধ্য আকাশে নিয়ে। উদ্দেশ্য সরাসরি কটকা অভয়ারণ্য।
কিছু ট্রাভেলার সরাসরি মংলায় চলে যায়, যাদের রিসিভ করে গাইড মুজাহিদ। আর আমি কাটাখালী থেকে ঢাকা হতে আসা ট্রাভেলারদের নিয়ে মংলায় পৌছি। আমাদের ভ্রমণ তরীতে যার যার কেবিনে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবারের আয়োজন। আর এরই মধ্যে তরী ছুটছে পশুর নদী ধরে কোজাগরী পূর্ণিমা মাথার উপর নিয়ে। ট্রাভেলারেরা অস্থির, রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য, কিন্তু বেশীক্ষন সেই সুযোগ দিলাম না। কারণ সকালে অপেক্ষা করছে ভয়ংকর সৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে এডভেঞ্চার যাত্রা।
ভোর সাড়ে চারটায় ঘুম ভাঙলো, কিছু ট্রাভেলার তখনই উঠলো আর কিছু ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে। আমাদের তরী তখন হোমরা(সুন্দরী খাল) খালে, দুপাশে সবুজ ঘন বন, পূব আকাশে রক্তিম সূর্যের উকি,আর অল্প বিস্তর কুয়াশা। চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যে বাক রুদ্ধ আমরা। ঐতো খালের জল ছুয়ে উড়ে গেলো এক নিঃসঙ্গ বক। খালের পাড়ে হঠাৎ দেখা বুনো হাঁস(Finfoot) আর কেওড়া পাতা খেতে আসা হরিণের দেখাও পেলাম। এরই মধ্যে কটকা খালে আমরা, আর তখন সকালের নাস্তা রেডি। নাস্তার টেবিলেই রোমাঞ্চ ভর করলো আমাদের। কারণ গন্তব্য গভীর গড়ান বনের ভিতর দিয়ে ৪র্থ টাইগার টিলা জয় করা।
পুরো টিমের মধ্যে একমাত্র আমি এর আগে একবার গিয়েছিলাম এই ৪র্থ টিলায়। পথ চিনবো কিনা একটু ভাবনাতো হচ্ছিলোই।অফিস পাড় পার হয়ে কেওড়া গাছগুলোর তলায় কয়েক শত হরিণের বিচরণ। কেওড়ার পাতা খেতে আসা হরিণের কাছ থেকে মহা আনন্দে ছবিতোলা হলো। আমি আর বন্ধু রকি টিমের নিয়ন্ত্রণ নিলাম শক্ত করে নির্দেশনা দিয়ে। কারন, এবার কাঁদা,শাস মূল আর ঘন গড়ান বনের ভিতর যাত্রা। সারিবদ্ধ ভাবে চলা শুরু,গানম্যানের আগে থাকার চেষ্টায় বন্ধু তালাশ, সে যে শপথ করেছে বাঘ মামার সাক্ষাৎকার এবার নেবেই।সিদ্ধান্ত নিলাম ৩নং টিলায় আগে যাবো, তাই প্রথমেই বেশী গভীর বনে প্রবেশ। সামনে অজানা প্রাণীর ডাক। বাঘিনী বাচ্চা দিয়েছে চার মাস আগে, বাচ্চার ডাক এরকমই হয়।পথে পড়লো অজগরের বাচ্চা আর বাঘের পায়ের ছাপ। সামনে এগোনোর সাহস হারালাম। ঘুর পথে এক, দুই, তিন নাম্বার টিলা নির্বিঘ্নে ঘুরে কাংখিত ৪র্থ টিলায় যাত্রার প্রস্তুতি। এই টিলাতেই বাঘিনী বাচ্চা দিয়েছিলো কিছু দিন আগে ৷ বাঘিনী বাচ্চা প্রসব করে সেখান থেকে সরে যায় বলে সাহস পাচ্ছিলাম। নিরাপত্তার কথা ভেবে একজন গানম্যানের জিম্মায় ট্রাভেলারদের রেখে আমি, রকি, তালাশ আর বাকি গানম্যান নিয়ে চললাম টিলার পথ দেখে আসতে, হেতেল কাটার ঝোপ পার হয়ে ঘন বনের ভিতর পথ করে চলছি। একটু নার্ভাস লাগছে, আবার জেদ কাজ করছে এই টিলা দেখাবোই। পথ হীন পথকে পথ করে শেষ পর্যন্ত গন্তব্যের কাছে পৌছালাম, এবং দু,জন ফিরে যেয়ে পুরো টিমকে নিয়ে আসলাম। এখন বাধা জল ভর্তি ছোট একটা খাল। গতবার এসেছিলাম ভাটির সময়। তখন দেখেছি খালে প্রচুর কাঁদা। কাঁদায় আটকে যাওয়ার ভয় আছে। তালাশ আর রকির সাহায্যে সাপোর্ট হিসেবে হেতেল গাছ নিয়ে নেমে পড়লাম। প্রায় বুক সমান পানি নির্বিঘ্নে পার হলাম। একে একে রকি,তালাশ, বুলবুল,শিমুল আর দু,তিন জন ট্রাভেলার পার হয়ে আসলো। বাকিরা ওপারেই রয়ে গেলো৷ স্বাদ পেলাম ৪র্থ টিলা স্পর্শের। গাছের গোড়ায়,আর মাটিতে বাঘের আচড়, গন্ধও পেলাম। খুব দ্রুত কিছু ছবি তুলে ফিরে আসলাম। ক্লান্তি নিয়ে নির্বিঘ্নেই ফিরলাম আমাদের ভ্রমণ তরীতে। এখন রেষ্টের পালা। স্নাক্স আর দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা যাবো জামতলা হয়ে বাদাম তলী সী বিচে।
দুপুরের খাবার শেষ, ট্রাভেলারদের ক্লান্তি উধাও।বেলা ৩:০০ টায় রওনা দিলাম। পল্টন থেকে সারিবদ্ধভাবে আগে পিছে গানম্যান নিয়ে চললাম। জামতলা “বাঘ মামার ডাইনিং” হিসেবে খ্যাত। কারণ এখানেই ফাকা প্রান্ত,ছন বন, মিঠা জলের পুকুর আর পর্যাপ্ত মোটা তাজা হরিণের অবস্থান। ৪৫ মিনিট মতো লাগলো বীচে পৌছাতে। পথে দেখলাম হরিণের ছুটে চলা। সূর্য মামা পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ছে। কনে দেখা আলো। চলছে ছবিতোলার উৎসব। কেউ কেউ হাটু জলে সমূদ্রে নেমে হাটছে। এক পাশে ঝড়ের আঘাতে এলোমেলো সবুজ ম্যানগ্রভ উদ্ভিদ অন্য পাশে দিগন্ত রেখা মিলেছে বিশাল সমূদ্রে। আমাদের দুই গর্ব বঙ্গোপসাগর এবং সুন্দরবন এক সাথে, ভালোবাসি আমার সোনার বাংলাকে। স্বাদ না মেটে যতো দেখি।
মুগ্ধতা পিছনে ফেলে ফেরার পথ ধরলাম৷ নিরাপত্তার জন্য সন্ধ্যার আগেই তরীতে ফিরতে হবে। ফেরার পথেও দেখা পেলাম হরিণের পাল, শুকর, বানরের। আর চললো ছবি তোলা। তরীতে ফিরে স্ন্যাক্স খেয়ে যার যার মত সময় কাটানো রাতের খাবারের অপেক্ষায়। রাতের খাবার খেয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম৷ সকালে অপেক্ষা করছে চরম মাত্রার এডভেঞ্চার যাত্রা।
ভোর সাড়ে চারটায় তরী চললো ছিটে কটকা ধরে কচিখালির উদ্দেশ্যে। সকালের নাস্তা খেয়ে আমরা নামবো কাঙ্ক্ষিত ডিমের চরে। ডিমের চরের তিন পাশে সমূদ্র আর এক পাশে নদী দিয়ে ঘেরা সুন্দরবনে আমার সবচেয়ে প্রিয় ভূ-খন্ড। পরিকল্পনা অনুযায়ী বীচ ধরে কিছু দূর দক্ষিণে যেয়ে তারপর বনের গভীরে যাওয়া। সারিবদ্ধভাবে আমরা, কচ্ছপ গতিতে চলছি, কারণ কাদাঁ, শ্বাস মূল আর ঘন গড়ান বনের মধ্য দিয়ে আমাদের পথ হীন পথে সামনে এগিয়ে চলা। বহু ট্যুরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন, বিনয়ী সৈকত ভাই জিপিএস এর মাধ্যমে দিক নির্দেশের সহযোগিতা করছেন। অল্প দূরে কাঁদা মুক্ত উচু যায়গা পেলাম। এমন জায়গাই বাঘের বিশ্রামের জন্য উপযুক্ত। কিছু সময় কাটিয়ে সোজা পূর্ব দিকে চলা শুরু। শ্বাস মূল এড়িয়ে কাঁদার মাঝে চলছি। ভয়ংকর নিস্তব্ধতার মাঝে আমাদের চলার শব্দ আর থেমে থেমে নাম না জানা পাখির ডাক পরিবেশ অন্য রকম করে তুলছে। ঐ দূরে পুরুষ শিংগেল হরিণ ডেকে উঠলো তার সঙ্গিনীর মনযোগ আকর্ষণের চেষ্টায় । বনের নিঃসর্গ পরিবেশ ছাড়া আর কোনো প্রাণী চোখে পড়ছে না। কিন্তু অনুভব করছি চার পায়ের কোনো প্রাণীর দু চোখ আমাদের অনুসরণ করছে। আমাদের গান ম্যান সর্বোচ্চ সতর্ক। বুলবুল, শিমুল,রকি, আর আমি ভাগ হয়ে আছি ট্রাভেলারদের সাথে। আমাদের নাক এবং চোখ সতর্ক। যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমরা প্রস্তুত। শ্বাস মূল এড়িয়ে মোটামুটি নির্বিঘ্নেই চললাম। এরকম দূর্গম পথ চললাম প্রায় ২.৫ কিলোমিটার। প্রায় ৩ ঘন্টা পর আমরা বের হলাম ডিমের চরের পূর্ব প্রান্তে। সমূদ্রেজোয়ার চলছে। সৈকত পেরিয়ে জল জঙ্গল ছুইছুই। সৈকত ধরে এগোনো মুশকিল ঝড়ের আঘাতে গাছের এলোমেলো পড়ে থাকার কারণে। ক্লান্ত সবাই। বালুর উপর বসে বিশ্রামে। রকির সাথে আলোচনা চলছে কিভাবে ফিরবো। হঠাৎ শিমুলের জোরে চিৎকার , জোয়ারে ভেসে আসা বালুর মধ্যে থাকা পেরেক তার পায়ে গেঁথে, বেশ বাজে অবস্থা। সঙ্গে থাকা প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম কাজে লাগিয়ে,সামাল দেই মোটামুটিভাবে। প্রাথমিক চিকিৎসা ভালোই হলো। সংকট দেখা দিলো, খাবার পানির।এক ফোটা খাবারের পানি নেই কারো কাছে,সবাইকে কেওড়ার ফল রাখতে বলি,পানি পিপাসা মেটাতে।এবার ফেরার পালা। ছোট বড় ঝড়ে ভাঙ্গা গাছের মধ্য দিয়ে চলছি। কষ্টসাধ্য পথ। এভাবে কিছু দূর যেয়ে উন্মুক্ত সৈকত পেলাম। নিমিষেই সকলের ক্লান্তি উধাও। আবারো টের পেলাম সৌন্দর্যের মাঝে ক্লান্তির স্থান নেই৷ এক পাশে সবুজ বন অন্য পাশে নীল সমূদ্র। আবারো আমাদের দুই গর্বের মিলন। বীচটা অপরূপ। বীচ ধরে সামনে এগোতেই “ফাইসা” নামক মাছ লাফিয়ে সরে যাচ্ছে গভীর সমূদ্রে। কয়েকজন মাছ তাড়ানোর জন্য দৌড়ে চললো বীচ ধরে৷ সবাই পানি খাওয়া ভুলে গেলো।প্রায় দুই কিলোমিটার পথ বীচ ধরে হেটে কখন যে পার হলাম টের পেলাম না। এডভেঞ্চার এখানেই শেষ না। শেষের দিকে এসে খালের কারণে আর এগোনো সম্ভব না৷ তাই রকি কয়েক জনকে নিয়ে চললো ট্রালার নিয়ে আসতে। এদিকে সমূদ্রে ভাটি শুরু হয়েছে কিছুক্ষণ আগে৷ দ্রুত সমূদ্রের জল নেমে যাচ্ছে। ট্রলার এসে ডুব চরে আটকে গেলো। পানিতে নেমে সবার চেষ্টাতেও বেশী দূর এগোনো সম্ভব হলো না। এদিকে ঘড়ির কাটায় বেলা ৩:৩০ মিনিট। ক্ষুধাও চরম আকার ধারণ করেছে৷ এদিকে দ্রুত পানি কমতে থাকে,একটু ভাবনা,এত মানুষ,খাবার পানিও নেই। ড্যানি আর ইমরান ভাই আরো একটা ভেসেল নিয়ে বেশ দূরে ছিলো । এতো দূর থেকেও খেয়াল করেছে আমাদের। খুব দ্রুত ছুটে আসে আমাদের কাছে। এবং উদ্ধার করে নিয়ে যায় আমাদের ভেসেলে। আমরা সুন্দরবন নিয়ে যারা কাজ করি তারা সকলে খুব হেল্পফুল। তাই সুন্দরবন ট্যুরিস্টদের জন্য সব সময় নিরাপদ। তরীতে ফিরেই খাবারের উপর ঝাপিয়ে পড়লাম। তারপর লম্বা বিশ্রাম।
তরী চললো হাড়বাড়িয়ার উদ্দেশ্যে। সকালে নির্বিঘ্নে “হাড়বাড়িয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক” দেখে চলে আসলাম “করমজল “। করমজলে কাছ থেকে হরিণকে ঘাস খাইয়ে এবং রোমিও, জুলিয়েট পিলপিল নামের বৃহৎ আকারের কুমির ও তাদের অসংখ্য বাচ্চা দেখে আমাদের তরীতে ফিরে আসলাম। আমাদের তরী চললো মংলা হয়ে খুলনার উদ্দেশ্যে। সন্ধ্যার পর খুলনায় পৌছে আমাদের যাত্রা সমাপ্ত হলো৷ এই ট্যুরে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিলো সব ট্রাভেলাররা পরিবেশের ব্যাপারে ছিলো সচেতন৷ এই ট্যুরের সব ট্রাভেলারদের পক্ষথেকে সকলকে অনুরোধ ” আসুন শুধু নিজেকে নয় দেশটাকেও ভালোবাসি, পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকি। এবং বিদেশ নয়, আগে নিজের দেশ দেখি।
ভ্রমণ সময়: ২৫ শে অক্টোবর থেকে ২৮ শে অক্টোবর ২০১৮
About Post Author
#Adventure#Bangladesh#Royal Bengal Tiger#sundarbans#Tourism#travel#এডভেঞ্চার#কটকা#বাংলাদেশ#রয়েল বেঙ্গল টাইগার#রোমাঞ্চকর#সুন্দরবন

