প্রচারণা চলছে সেন্টমার্টিন ট্যুরিস্টদের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। আমার স্নেহের এক ছোটো ভাই খুব করে ধরলো ডিসেম্বরেই সেন্টমার্টিন যাবে। কিছু মানুষকে ভালোলাগার অনুভূতি দিতে পারলে এক ধরণের সুখ হয়৷ তাই শত ব্যাস্ততার মাঝেও রাজি হলাম।
ট্যুরিস্টদের খুব চাপ।পেশার কারণে ট্যুরিস্ট এলাকার পরিবহন এবং হোটেলের সঙ্গে সম্পর্ক আমার ভালো। তাই একটু চেষ্টাতেই টিকিট এবং হোটেল বুকিং সম্পূর্ণ হলো।
আমরা যাত্রা করলাম বৃহস্পতিবার রাতে। চিটাগং, কক্সবাজার হয়ে আমাদের বাস টেকনাফ পৌছালো শুক্রবার সকালে। কেয়ারী সিন্দাবাদে আমাদের যাত্রা। চরম ভিড় ঠেলে শীপে চড়লাম৷ শীপের স্টাফ পরিচিত হওয়ায় বাড়তি সুবিধা নিয়ে একটু নিরিবিলি বসার ব্যবস্থা হলো।শীপ চলছে নাফ নদী ধরে হুমায়ূন অহম্মেদের দ্বারুচিনির দ্বীপের উদ্দেশে।
সকালের সোনা ঝরা রোদের আলোয় দূরের মায়ানমারের পাহাড় এবং স্বচ্ছ নদীর জল। আমাদের মাঝে কথা হচ্ছে কম৷ সৃষ্টির সুন্দর নয়নে জড়াতেই সবাই ব্যাস্ত। কিছু সময় পরে টেকনাফের সর্বশেষ ভূ-খণ্ড শাহপরী দ্বীপ পেরিয়ে নীল জলরাশীর উত্তাল সমূদ্রে আমাদের শীপ। খাবারের সন্ধানে সীগাল পাখি শীপের পিছু নিয়েছে যাত্রার শুরুতেই ৷ এতো মানুষ সহ শীপকে মনে হচ্ছিলো অতিক্ষুদ্র। চারদিকেই দিগন্ত হারানো নীল জলরাশী। শীপ চলছে নির্ধারিত গতিতে। ধীরে স্পষ্ট অতীত নামের নারকেল জিঞ্জিরা। অস্থির মনে অপেক্ষায় কখন এই অপরূপ ভূমিতে পদচারণ হবে। অপেক্ষার পালা শেষ করে জেটিতে ভিড়লো আমাদের শীপ৷ আমরা নেমে চললাম পূর্বেই বুকিং দেওয়া হোটেলে। যাত্রা পথের ক্লান্তি দূর করতে বিশ্রাম এবং দুপুরের খাবার খেয়েই সৈকতে যাওয়ার স্বীদ্ধান্ত আমাদের।
সেন্টমার্টিন আমি পূর্বেই একাধিক বার গিয়েছি৷ তাই আমার বেশী মনোযোগ সাথীদের অগ্রাধিকারের দিকে। হোটেল রুম থেকেই সমূদ্র দেখা যায়৷ কিছু সময় রুমেই বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে বের হলাম বীচের উদ্দেশে। ভালোলাগার সময়ে তখন অনেকেরই হাত তার সঙ্গী বা সঙ্গিনীর হাতে। থেমে থেমে ছবি তোলা হলো, কেউ আবার আলতো করে পা ভিজিয়ে নিলো সাগরের জলে। সন্ধ্যার পরেও সৈকতে রইলাম । হেটে চললাম কিছু দূরের সাগর পাড়ের দোকানে। উদ্দেশ্য সগরে ধরা মাছ, কাকড়া দিয়ে রসনা বিলাস। রাতের খাবার সাগর পাড়ে সেরে ফেললাম৷ তারপর ফিরলাম আমাদের অস্থায়ী নিবাস হোটেল রুমে। সাগর পাড়ের হোটেল রুমেও সুন্দর কিছু সময় পার করলাম। ভালোলাগা নিয়েই সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম নতুন সূর্যের আলোয় দ্বীপ ঘুরে দেখার ইচ্ছে নিয়ে।
পরের দিন খুব ভোরে উঠেই আমরা সৈকতে। যে দিকে নয়ন ফিরাই অথই নীল জলরাশী, ছন্দে চলা ঢেউ, স্নিগ্ধ বাতাস, সোনালী রোদ। দূরে দিগন্ত হারিয়েছে আর জেলেদের ট্রলার ছুটে চলেছে সেই দিগন্তের দিকে। পার করলাম ভালোলাগার কয়েক ঘন্টা।
ফিরে এসে দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিলাম কিছুক্ষণ। বিকেলের আগেই বের হলাম সাইকেল নিয়ে। সৈকতের জল ছুয়ে ছুটলাম দ্বিচক্রযানে। সাথে চললো ফটোসেশান। ভালো সময় দ্রুত ছুটে চলে৷ এরি মধ্যে সূর্য তার দিনের দায়িত্ব শেষ করে নীল সমূদ্রে আশ্রয় নেওয়ার পথে । সাইকেল নিয়ে সঙ্গের একজন দল ছুট হয়ে কোথায় যেনো চলে গেলো। অন্ধকার হয়ে আসছে, তার ফোনও আমার কাছে। নতুন চালক। খুঁজতে বের হলাম। সৈকতের কয়েক মাইল ছুটেও খুজে পেলাম না। এক দলকে পাঠালাম হোটেলের কাছে, আমি সৈকত ধরে খুঁজেই চলেছি। হোটেলের কাছে যেয়ে খুঁজে পেলো। আমাদের উল্টো দিকে চলে গিয়েছিল। অস্থির কিছু সময় পার করলাম। হালকা ধমক দিয়ে হোটেলে ফিরলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বের হলাম রাতের খাবারের জন্য। সঙ্গী একজনের মাছ , কাকড়া খুব পছন্দ। তাই চললাম দূরের সৈকত পাড়ের সেই দোকানে। সেই রাতে শীত খুব বেশী। মাছের বারবিকিউ, চিংড়ি ভাজা আর পরোটা অর্ডার করে অপেক্ষা করছি৷ কনকনে ঠান্ডা বাতাস। আমি চাদর জড়িয়ে উপভোগ করছি অন্ধকারে সাগরের ঢেউয়ে জ্বলে উঠা সাদা ফেনা। পাশে দাড়ানো পাতলা সোয়েটার পরা একজন কে চাদরের ভাগ দিতে হলো শীতের হাত থেকে বাঁচাতে। রাতের সমূদ্রও যে মুগ্ধতা ছড়াতে পারে পূর্বে জানা ছিলো না। বিরামহীন ছন্দে সাগরের গর্জন সংগীতের আবহ সৃষ্টি করেছে।
বেশ দেরী হলো খাবার তৈরী হতে। ক্ষুধাও তাই বেশী৷ ভালোই খাওয়া হলো। বেশ রাত করেই হোটেলে ফিরে সেন্টমার্টিনে শেষ রাত্রিযাপন করলাম।
পরদিন সকালে উঠে এক দল চললো ছেড়া দ্বীপের উদ্দেশে আর আমরা রইলাম হোটেলে। সকালের নাস্তা করে সৈকতে সময় পার করলাম। হোটেলে ফিরে যার যার লাগেজ গোছাতে হলো। প্রিয় দ্বারুচিনির দ্বীপকে বিদায় জানানোর সময় হয়েছে । দুপুরের খাবার খেয়ে ফিরতি জাহাজের যাত্রি আমরা।
সঠিক সময়ে জাহাজ ছাড়লো। পিছনে ছোট হতে থাকলো প্রিয় ভূ-খণ্ড। যখন নাফ নদীতে তখন পড়ন্ত বিকেল। পূর্বের মতোই সীগাল গুলো আমাদের সঙ্গী। রক্তিম সূর্য এবং উড়ন্ত সীগাল, শেষ বারের মতো মুগ্ধ হলাম। কিছু ছবি তুলতে ভুল হলো না।
সময় মতো এবং নিরাপদেই ফিরলাম টেকনাফের ঘাটে। নির্ধারিত বাসে করেই রওনা হলাম যান্ত্রিক জীবনের পথে৷
আমাদের দেশ অনেক সুন্দর। দেশকে ভালোবাসি। পরিচ্ছন্ন রাখি আমাদের চারপাশ। যত্রতত্র ময়লা ফেলা এবং পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকি।
সময়কালঃ ডিসেম্বর ২০১৮

