মানুষ জন্মগতভাবেই সৌন্দর্যের পূজারি। কোনো মানুষ যখন হৃদয়ে সৌন্দর্য ধারণ করে, তখন সে তা ধ্বংস করা থেকে নিজে থেকেই বিরত থাকে। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপার লীলাভূমি। এই দেশে রয়েছে বৈচিত্র্যময় প্রাণীকুল, যা সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাণিপ্রেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এই প্রাণিপ্রেমের টানেই বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রীরা (ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার) দুর্গম অঞ্চলে ঘুরে বেড়ান এবং বন্যপ্রাণীর ছবি ধারণ করেন। একজন আলোকচিত্রীর তোলা একটিমাত্র ছবিই বন্যজীবনের চিরন্তন সৌন্দর্য মানুষের মাঝে পৌঁছে দিতে পারে। আর সেই কাজটিই নিপুণভাবে করে যাচ্ছেন আমাদের দেশের বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রীরা। দীর্ঘদিন সুন্দরবনে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে এই সত্যটি আমি খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছি।
গত শীত মৌসুমে পাবনা থেকে আসা একদল পর্যটককে নিয়ে আমার সুন্দরবন ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল। সেই দলে কয়েকজন ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার ছিলেন।
ট্যুরের প্রথম সকালে বনের খালে আমাদের নৌকা চলছিল। হঠাৎ দেখা গেল, একটি ধবল বক জল ছুঁয়ে ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে, পাড়ে বসে খাবার খুঁজছে, আবার জলের উপর প্রতিচ্ছবি ফেলে উড়ছে। ভোরের আলোয় সেই নয়নাবিরাম দৃশ্য যেমন চোখ জুড়ানো ছিল, তেমনি আলোকচিত্রীরাও শাটার চেপে চমৎকার কিছু ছবি ক্যামেরাবন্দি করলেন।
দলটিতে এমন একজন পর্যটক ছিলেন যিনি স্বীকার করলেন যে, প্রতি শীতে পাখি শিকার করতেন এবং বাজার থেকে পরিযায়ী (অতিথি) পাখি কিনে খেতেন। কিন্তু সেদিন সকালে আলোকচিত্রীদের প্রকৃতিপ্রেম এবং ক্যামেরার লেন্সে বন্দি পাখির সেই জীবন্ত সুন্দর রূপ দেখে তাঁর ভেতরে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এলো। তিনি সেদিনই প্রতিজ্ঞা করলেন, আর কখনো পাখি শিকার করবেন না এবং এদের মাংস খাবেন না।
সচেতনতা তৈরির এমন বাস্তব ও ইতিবাচক উদাহরণ নিশ্চয়ই আমাদের আরও রয়েছে।
প্রতি বছর সুন্দরবনের অপার সৌন্দর্য আর জীববৈচিত্র্যের টানে বহু ফটোগ্রাফার ছুটে আসেন। প্রকৃতি এবং বন্যজীবনের প্রতি তাঁদের যে গভীর ভালোবাসা, তা ফুটে ওঠে পরম যত্নে ধারণ করা প্রতিটি আলোকচিত্রে। আর সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে এই ছবিগুলো ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশের অগণিত মানুষের কাছে। মানুষ যখন বনের এই অপরূপ সৃষ্টিকে ছবির মাধ্যমে দেখে, তখন প্রকৃতির ক্ষতি করতে বা বন্যপ্রাণী হত্যায় নিরুৎসাহিত হয়। তা ছাড়া, বনে ঘুরতে আসা সাধারণ পর্যটকও আলোকচিত্রীদের বড় লেন্সের ক্যামেরা ও ব্যতিক্রমী বেশভূষা দেখে তাঁদের প্রতি কৌতূহলী হয় এবং বন্যপ্রাণীর ব্যাপারে সচেতন হয়ে ওঠে।
একজন পেশাদার বা শৌখিন আলোকচিত্রী স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ক্যামেরাবন্দি করা প্রাণীটির আচরণ ও জীবনচক্র সম্পর্কে বেশ ভালো জ্ঞান রাখেন। তাঁরা যখন সাধারণ মানুষের কাছে গল্পে গল্পে তুলে ধরেন—একটি পাখি বা একটি বাঘ আমাদের পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের (ইকোসিস্টেম) জন্য কতটা অপরিহার্য, তখন সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে বড় পরিবর্তন আসে।
সুন্দরবন বা অন্য যেকোনো বনে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণে আলোকচিত্রীদের এই ভূমিকা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। তাঁদের কাছে বন্যপ্রাণীর গল্প শুনে এবং ছবি দেখে সাধারণ মানুষ অনুপ্রাণিত হয়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এগিয়ে আসে—এমন বাস্তব অভিজ্ঞতার সাক্ষী আমি নিজে। তাই বলা যায়, একটি ছবি হতে পারে হাজার শব্দের লেখার চেয়েও শক্তিশালী। সুন্দরবনসহ আমাদের প্রকৃতি সুরক্ষায় এক-একটি নীরব হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে ফটোগ্রাফারের ধারণ করা একটি স্থিরচিত্র।
মো: তানজির এইচ রুবেল | সিইও, ফেমাস ট্যুরস বিডি।

